আদি মানব হযরত আদম আ. এর যুগ থেকেই এই হক বাতিলের দ্বন্দ্ব প্রবাহমান। সেই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল উম্মতের কান্ডারী নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ও তাঁর তিরোধানের পর বহু বাতিল ফিরকার (ভ্রান্ত দলের) আবির্ভাব হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, উম্মতে মুহাম্মাদী ৭৩ ফিরকায় বিভক্ত হয়ে পড়বে। ৭২ ফিরকা দোযখী হবে এবং এক ফিরকা বেহেশতী হবে। আর সেই বেহেশতী দলটি হলো আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াত।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের খিলাফ বিভিন্ন যুগে যে সকল বাতিল ফিরকা সৃষ্টি হয়েছে, তাদের মধ্যে খারিজী, রাফেজী, মুতাজিলা, কাদরীয়া, জাবরীয়া, শীয়া, মুরজিয়া, জাহমীয়া, মুজাসসিমা, মুশাব্বিহা, মুয়াত্তিলা, কারামিয়া, হাশাবিয়্যাহ ও ওহাবী প্রভৃতি ফিরকার নাম বিশেষভাবে উল্লিখিত।
পূর্ব যামানায় যে সকল ইফরাতপন্থী বাতিল ফিরকা সৃষ্টি হয়েছিল যথা- খারিজী ফিরকা, মুতাজিলা ফিরকা ও ওহাবী ফিরকা, তাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমাদের উপরিউক্ত দাবির যথার্থতা প্রতীয়মান হবে।
বর্তমান ‘আহলে হাদীস’ নামের নতুন ফিরকা মূলত সেই মুশাব্বিহা-মুজাসসিমা ও ওহাবী ফিরকার আকিদার ধারক-বাহক ও প্রচারক। আকিদা, আমল ও আদর্শে তারা সকলেই এক, শুধু নামের পার্থক্য মাত্র। তাদের আকিদা হলো- আল্লাহ তায়ালা হাত, পা, চোখ, মুখ, নাক ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গধারী। তিনি আকার-আকৃতিধারী। তিনি উপরের দিকে আরশের উপর অবস্থান করেন এবং প্রতি রাতের শেষ ভাগে প্রথম আসমানে অবতরণ করেন। (নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক) এর রওজা মুবারক যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর (ভ্রমণ) করা বিদয়াত-হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, নবী-রাসূল, ওলী বা নেককার সালেহ বান্দার ওসিলা দিয়ে দুয়া করা শিরক। পীর-মুরিদী ও মাযহাব মানা হারাম-শিরক। এ ধরণের শত শত বাতিল আকিদা তারা নিজেরা পোষণ করে এবং এগুলো সরলমনা মুসলমানদের নিকট প্রচার করে।
বর্তমান সময়ে তাদের এই বাতিল আকিদা প্রচার-প্রসার এক মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হায়েজে।
ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আছে যখনই কোন বাতিল মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রতিহত করার জন্য কিছু হক্কানী যোগ্য আলেম তৈরী করে দেন। সে সকল হক্কানী উলামায়ে কিরাম কুরআন-সুন্নাহর আলোকে লেখা-লেখনী, ওয়াজ বক্তৃতা ও বাহাস-মুনাযারার মাধ্যমে তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়ে তাদেরকে নির্বাক, নিশ্চুপ, নিশ্চিহ্ন করে দেন।
ইসলামের ইতিহাসে যে সকল বাতিল ফিরকার আবির্ভাব হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে যে দল মারাত্মক কুফরী আকিদা পোষণ করে তারা হলো মুজাসসিমা (দেহত্ববাদী) ও মুশাব্বিহা (সাদৃশ্যদানকারী) নামে দুটি দল। তাদের প্রধান আকিদা হলো আল্লাহ তায়ালা হাত, পা, মুখ, চোখ, নাক, কান, চেহারা বিশিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গধারী। আর তিনি উপর দিকে সপ্ত আসমানের উপরে আরশে অবস্থান করেন। সেখান থেকে প্রতি রাতের শেষভাগে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন। (নাউযুবিল্লাহি মিল যালিক)। অথচ সকল আলিম-উলামা, হক্কানী পীর-মাশাইখসহ সকল জনসাধারণ জানতেন আল্লাহ তায়ালা এগুলো থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র ও মুক্ত।
এই বাতিল ফিরকার আবির্ভাবের শুরুতেই হক্কানী বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম তাদের যথার্থ জবাব দেন এবং তাদের এই বাতিল আকিদার দাফন সম্পন্ন করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ওহাবী, সালাফী, তাইমী (ইবনে তাইমিয়াপন্থী), আহলে হাদীসদের অন্যতম প্রধান গুরু ইবনু তাইমিয়া সেই পচা দুর্গন্ধযুক্ত লাশ কবর থেকে তুলে নতুন রঙে আমদানি করে। কিন্তু তার সেই বাতিল আকিদারও কবর রচিত হয় সমসাময়িক আলেমদের দালিলিক ও যৌক্তিক লেখনী এবং জোরালো বক্তব্যের মাধ্যমে। তার প্রায় পাঁচশত বছর পর মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব নজদী সেই বাতিল আকিদাগুলোকে নতুন মোড়কে মানুষের নিকট প্রচার করতে শুরু করল। কিন্তু অল্প কিছু দিনের মধ্যেই আলিমগণের সোচ্চার পদক্ষেপ তার সেই বাতিল আকিদার সমাধি রচনা করে। কিন্তু আফসোসের বিষয় বর্তমান সৌদি আরবের একদল তাইমিয়াপন্থী গাইরে মুকাল্লিদ লা-মাযহাবী ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রে তাদের খয়েরখা ব্যক্তিরা সেই বাতিল আকিদার (Representative) প্রতিনিধিত্ব ও ফেরিওয়ালার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।
আরব-অনারব বিশ্বের বিজ্ঞ যোগ্য হকপন্থী আলেমগণ তাদের বিরুদ্ধে হুংকার দিয়ে ময়দানে ঝাপিয়ে পড়েন। মুসলমানদের নিকট তাদের এই আকিদার নেপথ্যে ইয়াহুদী-নাসারাদের ষড়যন্ত্রের কথা স্পষ্ট করেন। এবং অদ্যবধি তাদের প্রতিবাদ ও প্রতিহত করতে নিয়মিত তাদের কলমী যুদ্ধ, বাহাস, ওয়াজ মাহফিল অব্যাহত আছে।
বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশের এক শ্রেণীর নামধারী আলিম, ওহাবী ও তাইমীদের দোসর বাংলাদেশে সেই বাতিল আকিদার প্রচার-প্রসারে লিপ্ত। তারা তাদের এজেন্ট হিসেবে এ দেশে বাতিল আকিদার আমদানীকারক। তারা বর্তমানে খুব জোরে
সোরে উচ গলায় প্রচার করছে الرحمن على العرش استوى ‘রহমান আরশের উদ্দ অধিষ্ঠান করলেন।’ এমনকি তাদের কেউ এই আয়াতের অনুবাদ করতে গিয়ে বলে ‘আল্লাহ আরশের (ছাদের°) উপর উঠেন। ‘৪ এ বিষয়ে তাদের কেউ কেউ পুস্তিক। রচনা করেছে, এই শিরোনামে “)ئن الله( আল্লাহ কোথায়”?
সম্প্রতি আমার বন্ধুবর জনাব মো. ওবাইদুল ইসলাম (শামীম) আমাকে ‘কুরআন সুন্নাহর আলোকে আল্লাহ ও রাসুল (ছাঃ) সম্পর্কে সঠিক আকিদা’ নামে একটি বই হাতে দিল এবং আমার অফিসে বসেই প্রথমে বইটির প্রকাশকের নিকট ফোন করে লেখকের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে। এরপর লেখকের নিকট ফোন দিল। লেখকের সাথে সে সালাম ও কুশল বিনিময় করে কিছু কথা বলে হুজুরের সাথে কথা বলেন বলে ফোনটা আমার নিকট দিল। আমি তার সাথে প্রথমেই الرحمن على العرش استوى এই আয়াত সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম, এই আয়াতের ইস্তিওয়ার অর্থ কি? সে খুব জোরে সোরে বলল, আল্লাহ আরশে অবস্থান করেন। আমি তাকে পুনরায় প্রশ্ন করলাম, তাহলে, وغى أقرب إليه من حبل الوريد এই আয়াতের অর্থ কি হবে? সে বলল, এর দ্বারা ফিরিস্তা উদ্দেশ্য হবে। আমি বললাম এখানে ফিরিস্তা الرَّحْمٰنُ عَلَى الْعَرْشِ استوى ‘ওখানে আল্লাহ স্ব শরীরে’ একথা কে বলেছেন? সে বলল, আল্লাহই বলেছেন, الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى এখানে রহমান কে আপনি না আল্লাহ? আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, وَمَنْ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حبل الوريد এওতো আল্লাহর কথা, এতো মানুষের কথা না। সে বলল, মানুষের কথা নারে ভাই ব্যাখ্যা আছে না, আসলাফদের (পূর্বসূরীদের) ব্যাখ্যা আছে না। আপনি কি নিজের মত অনুযায়ী চলবেন না আসলাফদের ব্যাখ্যা নিবেন? আমি বললাম ব্যাখ্যাদানকারী হিসেবে আমরা কাকে মানব? তিনি বললেন, সঠিক ব্যাখ্যা যে দেয় তাকে মানবেন। আমি বললাম, সলফে সালেহীন যারা আছেন তাদেরকে মানব। ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ., ইমাম মালিক রহ. কে মানব। তিনি বললেন, ইবনে তাইমিয়া কে? আমি বললাম ইবনে তাইমিয়া তো অনেক পরে। তিনি পুনরায় বললেন, ইবনে তাইমিয়াকে মানতে সমস্যা কি? আমি বললাম, ইবনে তাইমিয়া তো ৭০০ হিজরীর লোক। তার পূর্বে ৬০০ বছর মানুষ কি সালফে সালেহীন ছাড়া চলেছে? এ ব্যাপারে কি সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীদের কোন কথা নেই? এই ৬০০ বছরের মানুষ কি কোন ব্যাখ্যা করেন নাই? তারা কি ব্যাখ্যা ছাড়াই চলেছেন? আসল কথার উত্তর না দিয়ে সে আমাকে বলল, আপনি যদি ভালো কাজ করেন আপনিও সালফে সালেহীনের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এরপর সে আমাকে প্রশ্ন করল, আপনি কি করেন? আমি
তাকে বললাম, কি করি সেটা আসল বিষয় না, আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে খুশি হতাম। এরপর তিনি আমার প্রশ্নের সুষ্ঠু জবাব দিতে না পেরে রাগ হয়ে ফোনটি কেটে দিলেন।
এর পর সে (শামীম) বলল, দেখেন- এই বইয়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বাতিল আকিদা কিভাবে ছড়ানো হচ্ছে। মানুষ ঈমানহারা হচ্ছে আর আপনারা আলেমরা বসে বসে দেখছেন। তার এই আবেগ-উৎকণ্ঠা আমাকে আন্দোলিত করে।
এর আরোও কিছুদিন আগে ছারছীনা শরীফের আ’লা আমীরে শরীয়ত, আমীরে তরীকত, আমীরে হিযবুল্লাহ আলহাজ্জ হযরত মাওলানা শাহ্ মুহাম্মাদ মোহেবুল্লাহ হযরত পীর সাহেব হুজুর কিবলা (মু.জি.আ) এর হাতে শাইখুল ইসলাম ইমাম তকিউদ্দিন সুবকী র. প্রণীত ‘আস্ সাইফুস্ সাকিল’ এবং শাইখুল ইসলাম ইমাম যাহিদ কাউসারী র. কৃত টীকা ‘তাকমিলাতুর রদ’ এর অনুবাদকর্ম মাওলানা বদরুল আমীন অনুদিত ‘সাদৃশ্য বর্জিত তাওহীদ’ নামক কিতাবটি হাদিয়া স্বরূপ তুলে দিলে তিনি কয়েক পৃষ্ঠা উল্টায়ে বললেন, ‘এ কিতাবটি আলেমদের জন্য একান্ত দরকার। তবে সাধারণ মানুষের জন্য এ সকল বিষয়ে ছোট ছোট পুস্তক সংকলন করা দরকার।’
হুজুর কিবলার এ কথাটি আমার নিকট আদেশের মত মনে হলো। নিজের মধ্যে একটি জাগরণ সৃষ্টি হলো। এ ছাড়াও সাদৃশ্য বর্জিত তাওহীদ কিতাবের প্রকাশকের বাণীতে আমার জীবনের আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা উল্লেখ করেছি, যে ঘটনাগুলো আমাকে আকিদা বিষয়ে গবেষণা করতে ও লেখা-লেখি করতে অনপ্রেরণা ও উৎসাহ প্রদান করেছে।
পুস্তকটি সংকলনে যারা বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন তাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বিশেষ করে দারুননাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসার সুযোগ্য শাইখুল হাদীস আমার শ্রদ্ধেয় উস্তাদ আলহাজ্জ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ আব্দুল লতিফ শেখ (দা.বা.) এবং অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফকীহ আলহাজ্জ হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ বদরুল আমীন (দা.বা.)-কে যারা তাদের মহা ব্যস্ততার মাঝেও আমার এই ক্ষুদ্র কর্মটি সম্পাদনা করে আমাকে করেছেন কৃতজ্ঞ। সাথে এই পুস্তকটি প্রুফ রিডিং ও সংশোধনের কাজে যারা সহযোগীতা করেছে বিশেষ করে আমার স্নেহস্পদ মো. সিরাজুস সালেহীন, মো. আবু বকর, মুহাম্মাদ আলী হোসেন, মো. আবু জাফরসহ আরও যারা উৎসাহ প্রদান করেছেন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন সকলের জন্য মহান রবের দরবারে ফরিয়াদ আল্লাহ তায়ালা সকলকে জাযায়ে খায়ের (উত্তম প্রতিদান) প্রদান করুন। আমীন।
হক্কানী আলিম-উলামা, পীর-মাশায়িখগণের ধারাবাহিকতায় বাতিল সম্প্রদায়ের ভ্রান্ত আকিদার স্বরূপ উন্মোচনে এবং সমাজের দিশেহারা সরলমনা মুসলমানদের সঠিক পথের
দিশা দিতে আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস ‘আল্লাহ তায়ালা কোথায়? প্রশ্নের জবাব’। এই পুস্তকটি মুসলমানদের ঈমান-আকিদা হিফাজতে সামান্য উপকারে আসলেও আমাদের শ্রম সার্থক বলে মনে করব। আল্লাহ তায়ালা এই প্রয়াসটুকু কবুল করেন এবং লেখক, পাঠক, শ্রোতা, সাহায্যকারী, প্রচারক সকলের জন্য পরকালে নাজাতের অসিলা বানান। আমিন!!